নিজের সীমাবদ্ধতা এভাবে কজন বুঝতেন!‌

সরল বিশ্বাস

তিনি দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন!‌ এমনটা তিনি নিজে কখনই দাবি করেননি। মনে মনেও কখনও এমন ভ্রান্ত ধারণা ছিল না।

তিনি দারুণ বক্তা!‌ ধুর, তিনি কখনও তা মনেই করতেন না। নিজেই বলতেন, আমি ভাল বলতে–‌টলতে পারি না। ওর জন্য আলাদা পড়াশোনা লাগে, চর্চা লাগে। ওসব আমার নেই।

সততা নিয়েও কোনও ছুৎমার্গ ছিল বলে শোনা যায়নি। নিজেকে সৎ দাবি করেননি। বিশ্বাস করতেন, দোষ গুণ মিলিয়েই মানুষ। দল চালাতে গিয়ে এমন অনেক কিছুই করতে হয়, যার পর আর নিজেকে সৎ বলে দাবি করা যায় না।

খুব গরিব ছিলেন!‌ কখনই নিজেকে গরিব হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেননি। তিনি যেমন, ঠিক তেমনভাবেই মেলে ধরেছেন।

তারপরেও সোমেন মিত্র আর দশজনের থেকে আলাদা। কারণ, তিনি বুঝতেন নিজের সীমাবদ্ধতা কোথায়?‌ ৩২ বছরের বিধায়ক। কদিন বিধানসভায় গেছেন, হাতে গুণে হয়ত বলা যাবে। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় আমেরিকার রাষ্ট্রদূত হয়ে চলে যাওয়ার পর চাইলেই বিরোধী দলনেতা হতে পারতেন। তেমন কোনও বাধাও আসত না। হলেন না। তার বদলে বিরোধী দলনেতা করলেন জয়নাল আবেদিনকে। ছিয়ানব্বইয়ে সেই জয়নাল সাহেব হেরে গেলেন। এবার তো আর কোনও বাধাই রইল না। তারপরেও বিরোধী দলনেতা করলেন অতীশ সিংহকে। আর বিরোধী হুইপ আব্দুল মান্নানকে। কখনও পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার কথাও ভাবেননি। বিধানসভার কোনও কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার চেষ্টা করেননি।

somen2

বিধানসভার বিতর্কে অংশ নেওয়ার জন্য প্রায় মারামারি হত। অনাস্থা প্রস্তাবে বা স্বরাষ্ট্র বাজেটে কতবার তাঁকে দিয়ে শুরু করানোর চেষ্টা হয়েছে। তিনি সবিনয়ে ‘‌না’‌ করে গেছেন। বলেছেন, ছোট খাটো জনসভায় বলা এক জিনিস। বিধানসভা আমার জায়গা নয়। আমি ওখানে বলতে পারি না।

আর কোনও বিধায়ককে দেখেছেন এত অকপটে নিজের অক্ষমতা জানাতে!‌

প্রচার ছিল, সোমেন মিত্র নাকি গুন্ডা। তাঁর হাতে প্রচুর গুন্ডা আছে। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে, ভাষা কখনও শালীনতার সীমা ছাড়ায়নি। এমন কোনও শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করেননি যা শোভনীয় নয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এমন বাক সংযম আর কজন নেতা দেখিয়েছেন‌!‌

বরাবর মমতাকে বলেছেন, তুমি বিধান রায় হবে। আমি অতুল্য ঘোষ হয়েই খুশি। ২০০৯ এ চাইলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হতে পারতেন। সবিনয়ে বলেছেন, আমার কথা ভেবো না। আমি এই বেশ আছি।

তিনি কিংমেকার। বরাবর অন্যদের এগিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু নিজে পেছনেই থেকে গেছেন। সংগঠনেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছেন। নেহাত দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে একটা বিধায়ক পদ না থাকলেই নয়, তাই শিয়ালদা থেকে দাঁড়াতেন। বিধানসভায় নিজেকে মেলে ধরার বা পদ অলঙ্কৃত করার কোনও চেষ্টাই করেননি।

টিভি চ্যানেলের স্টুডিওতে তাঁকে দেখেছেন?‌ চাইলে যখন–‌তখন যেতে পারতেন। ঘটা করে প্রেস কনফারেন্স করতে পারতেন। কিন্তু বরাবর এগিয়ে দিয়েছেন মানস ভুঁইয়া, সৌগত রায়, সুব্রত মুখার্জিদের। তাঁর সঙ্গে মমতার বিবাদ নিয়ে এত হাজার হাজার শব্দ লেখা হয়। অথচ, নয়ের দশকেও তাঁর মুখ থেকে মমতার সম্পর্কে খুব একটা নেতিবাচক মন্তব্য বেরোয়নি। অন্যরা কাগজে নাম তোলার জন্য জ্বালাময়ী বিবৃতি দিয়েছেন। দায় নিতে হয়েছে সোমেন মিত্রকে। অথচ, সেই সময় তাঁর শিবিরের হয়ে যাঁরা মমতার সমালোচনা করতেন, তাঁদের অধিকাংশই আশ্রয় নিয়েছেন মমতা শিবিরে। অথচ, ‘‌নীলকণ্ঠ’‌ হয়ে দোষের ভাগীদার থেকে গেলেন সোমেন মিত্র।

গত কয়েক বছরের সোমেন মিত্রকে দেখে নয়ের দশকের সোমেন মিত্রকে মেলাতে গেলে মস্তবড় ভুল থেকে যাবে। তখনকার সোমেন মিত্র ছিলেন একেবারেই অন্যরকম। প্রচার থেকে অনেক দূরে। অথচ, প্রভাবে অনেকের থেকে এগিয়ে।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.