সে এক সময় ছিল, যখন বিজয়া দশমী মানে অন্য এক আবেগ। দুপুরেই দেবীর বিসর্জন। একটা বিষাদের ছায়া। সেই বিষাদকে ছাপিয়ে সন্ধেয় দেখা যেত মহামিলন। আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধুদের বাড়ি যাওয়া। বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা, ছোটদের আশীর্বাদ করা, আর সমবয়সীদের সঙ্গে আলিঙ্গন বা করমর্দন। শুভ বিজয়া। এই একটি দিন যেন হঠাৎ করে একে অন্যের আরও কাছাকাছি এনে দিত।
এই বিজয়া উপলক্ষ্যেই কারও বাড়িতে তৈরি হল নারকেল নাড়ু। কারও বাড়িতে নানারকম মিষ্টি। কেউ খাওয়াতেন ঘুগনি। কেউ আবার ঠান্ডা পানীয়। তখনও ওবেসিটি এভাবে চোখ রাঙায়নি। একটু আধটু মিষ্টি খাওয়ায় ডাক্তারের তেমন ফতোয়া ছিল না। এমন অনেক বাড়ি আছে, সারা বছর যাওয়াই হয় না। কিন্তু এই একটি দিনে বিধা দ্বিধায় যাওয়া যেত। মাস্টার মশাইদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হয় না। যে ছাত্ররা বাইরে থাকে, তারাও পুজোয় বাড়িতে এসে দশমীর দিন ঠিক হাজির হয়ে যেত মাস্টার মশাইদের বাড়ি। ছাত্র–শিক্ষক সম্পর্ক যেন খুঁজে পেত সেই হারানো উষ্ণতা। শুধু বিজয়ার দিনেই এই প্রণাম সীমাবদ্ধ থাকত না। এর রেশ চলত বেশ কয়েকদিন ধরে।
শুধু কি তাই! বিজয়া মানেই একসঙ্গে অনেক পোস্ট কার্ড আর ইনল্যান্ড লেটার কিনে আনা। প্রিয়জনদের চিঠি লেখা। ছোটরা জানাত প্রণাম, বড়রা জানাতেন আশীর্বাদ। কেউ কেউ হয়তো সারা বছর কোনও চিঠিই লিখতেন না। কিন্তু বিজয়ার সময় একসঙ্গে এক ডজন চিঠি লিখে ফেলতেন।
কালের স্রোতে সব কোথায় যেন হারিয়ে গেল। সেই চিঠি লেখাও অতীত। আত্মীয়, প্রতিবেশীদের বাড়িতেও যাওয়াও অনেকটাই কমে এসেছে। এখন ডিজিটাল যুগ। হোয়াটসঅ্যাপে একটা ছবি সবাইকে শেয়ার করে দিলেই বিজয়ার শুভেচ্ছা জানানো হয়ে যাচ্ছে। ছোট–বড়, বন্ধু–শিক্ষক সবাইকেই এক বার্তা। সেই বার্তাও ধার করা। এক মিনিটেই কত চেনা–অচেনা মানুষকে গণহারে শুভেচ্ছা জানানো হয়ে গেল। প্রযুক্তি হয়তো গতি এনে দিল। দ্রুত শুভেচ্ছা পৌঁছেও দিল। কিন্তু এই শুভেচ্ছার মূল্য কতখানি। একেকজনের মোবাইলে দুশো, তিনশো মেসেজ জমে আছে। অনেকে খুলেও দেখেন না। জানেন, এর ভেতর যা আছে, তাতে কোনও আবেগ নেই, কোনও আন্তরিকতা নেই। এই শুভেচ্ছা মনকে ছুঁয়ে যায় না।
সবকিছুই বড় বেশি যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। পুজোর ধুমধাম আছে। আড়ম্বর আছে। কিন্তু দেখনদারিটা যেন বড্ড বেশি। তেমনই বিজয়াও যেন প্রাণহীন, উষ্ণতাহীন একটা উপলক্ষ্য। ব্যস্ততা থাকবে। আগের মতো সেভাবে প্রথাপালনও হয়তো সম্ভব নয়। তবু এই একটি দিনে কিছু মানুষের কাছে কি পৌঁছোনো যায় না! একটি মেসেজের বদলে একটি আলিঙ্গন কি অনেক বেশি প্রাণের স্পর্শ এনে দেয় না!
