‌প্রতিভার এই অপমৃত্যুর দায় তাহলে কার?‌

একটা বিশ্বকাপ শেষ হতে না হতেই আরও একটা বিশ্বকাপ এসে যায়। যেমন, মাস দুই আগে ভারতের মেয়েরা জিতলেন ৫০ ওভারের বিশ্বকাপে। এই বছরই আবার মেয়েদের টি২০ বিশ্বকাপ। ফেব্রুয়ারি থেকে ছেলেদের টি২০ বিশ্বকাপ। সামনের বছর ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ। এদিকে, এখন চলছে অনূর্ধ্ব ১৯ ছেলেদের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ।

বছরে এতবার করে বিশ্বকাপ হলে তালগোল মেলানো সত্যিই বেশ কঠিন। সেই তিন তিন দশক আগে নচিকেতার গানে কয়েকটি লাইন ছিল— ‘‌চাল নেই, ডাল নেই, পয়সার দাম নেই/‌তবুও টিভি স্ক্রিনে খেলার বিরাম নেই।’‌ গানটি যখন লেখা, তখন টি২০ শব্দটাই আসেনি। আইপিএল তো ছিলই না। এখন তাহলে চেহারাটা কেমন?‌

প্রশ্ন হল, এই যে ঘটা করে টি২০ বিশ্বকাপ হচ্ছে, এত এত প্রতিভার ছড়াছড়ি, এঁদের ভবিষ্যৎ কী?‌ এঁদের কেউ কেউ হয়তো জাতীয় দলের আঙিনায় আসবেন। কেউ কেউ আইপিএলে বড় অঙ্কের দর পাবেন। দু–‌তিন বছর হয়তো চুটিয়ে খেলবেনও। কিন্তু তারপরই হারিয়ে যাবেন বিস্মৃতির অতলে। অন্তত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখলে তেমনটাই মনে হচ্ছে।

মানছি, ষোল জন ক্রিকেটার হয়তো জাতীয় দলে খেলবেন না। কিন্তু এখন টেস্ট, ওয়ান ডে, টি২০— তিন ফর্মাটে এত এত খেলোয়াড়ের অভিষেক হয়, এই ষোল জনের মধ্যে অন্তত চার–‌পাঁচ জন দেশের হয়ে খেলবেন, এটুকু তো আশা করাই যায়। কিন্তু গত কয়েকটি বিশ্বকাপের দিকে তাকালে ছবিটা একেবারেই উজ্জ্বল নয়।

২০১৮–‌তে অনূর্ধ্ব ১৯ পর্যায়ে ভারত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সেই দল থেকে জাতীয় দলে এসেছেন পৃথ্বী শা, শুভমান গিল, অভিষেক শর্মা, অর্শদীপ সিং। পরের তিনজন টিকে থাকলেও পৃথ্বী শা কোথায় যে তলিয়ে গেলেন!‌ ২০২০–‌তে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও সেই দল থেকে উঠে এসেছেন ধ্রুব জুরেল, রবি বিষ্ণোই, যশস্বী জয়সওয়াল, তিলক ভার্মা। কিন্তু তারপর থেকেই যেন বিপর্যয়ের শুরু। ২০২২ ও ২০২৪ সালে যে দুটি বিশ্বকাপ হয়েছিল, সেই দলের কাউকেই এখনও জাতীয় দলের আঙিনায় দেখা গেল না। ২০২২ এ তো ভারত চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল। কিন্তু যশ ধূল, রাজ বাওয়া, অঙ্গকৃশ রঘুবংশীরা আইপিএলের গণ্ডি থেকে আর বেরোতেই পারলেন না। ২০২২ এ যাঁদের বয়স ছিল ১৯, এখন তাঁরাই ২৩। সুনীল গাভাসকার থেকে শচীন তেন্ডুলকার, বিরাট কোহলি থেকে শুভমান গিল— এঁদের অভিষেক ১৮–‌১৯ বছরেই হয়ে গেছে। ২৩ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি। ২০২৪ এর বিশ্বকাপের দু’‌বছর পেরিয়ে গেল। সেই দলের কাউকেই জাতীয় আঙিনায় দেখা যাচ্ছে না। এমনকী কেউ যে দারুণ পারফর্ম করে সজোরে কড়া নাড়ছেন, এমনও নয়।

প্রশ্ন হল, গত দুটি বিশ্বকাপে যাঁরা খেলেছেন, এমন তিরিশের বেশি ক্রিকেটারকে জাতীয় দলের আঙিনায় দেখা গেল না কেন?‌ আইপিএলের অর্থ ও নানা হাতছানিতে তাঁরা কি হারিয়ে গেলেন?‌ ক্রিকেট থেকে তাঁদের ফোকাসটাই কি সরে গেল?‌ বিষয়টা সত্যিই ভাবার মতো। শুধু ক্রিকেটারদের দায়ী করে লাভ হবে না। সিস্টেমেও কোথাও একটা গলদ আছে। এত এত প্রতিভাকে আগলে রাখার ক্ষেত্রে বোর্ড বা নির্বাচকদের কি কোনও দায় ছিল না?‌ এনসিএ–‌র তাহলে কাজটা কী?‌ শুধু কেউ চোট পেলে সেখানে নাকি রিহ্যাবে যান। এনসিএ কি তাহলে ক্রিকেটীয় হাসপাতাল হয়েই থাকবে?‌ এত এত প্রতিভা উঠে আসছে বলে আমরা বড়াই করি। কিন্তু এত এত প্রতিভার অপমৃত্যুর দায় কার?‌

Previous post জ্যোতিবাবু থাকলে ফেসবুক ছেড়ে মানুষের কাছেই যেতে বলতেন
Next post জ্যোতি বসু, ছোট্ট নাম, বিরাট ব্যক্তিত্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *