‌প্রমোশন না ডিমোশন— বোঝার বুদ্ধিটুকুও অরূপের নেই

অজয় নন্দী

আচ্ছা, অরূপ বিশ্বাস ঠিক কোন দপ্তরের মন্ত্রী। মাঝে মাঝেই এই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে। নানা সময়ে অন্তত একশোজনকে এই প্রশ্নটা করেওছি। তৃণমূলের সমর্থকদের যেমন করেছি, তেমনই বাম বা বিজেপি সমর্থকদেরও করেছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর পেয়েছি, ক্রীড়ামন্ত্রী। অর্থাৎ, ক্রীড়া ছাড়াও যে তিনি আরও কোনও দপ্তরের মন্ত্রী, এটা অধিকাংশ লোকই জানে না।

অবশ্য যাঁদের জিজ্ঞেস করেছি, তাঁদের কোনও দোষ নেই। তাঁরা কাগজে মূলত তিন রকম অরূপ বিশ্বাসের ছবি দেখেন। ১)‌ ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে মাঠ পরিদর্শন করছেন বা খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ২)‌ তৃণমূল নেতা হিসেবে মিছিল করছেন, বা ছোটখাটো কর্মীসভায় ভাষণ দিচ্ছেন। ৩)‌ সুযোগ পেলেই ফিল্মস্টারদের সঙ্গে ছবি তুলছেন। তা সে চলচ্চিত্র উৎসব হোক বা ঘটা করে ভাইফোঁটা হোক।

এর বাইরে অন্য মন্ত্রী হিসেবে কাগজে তাঁর ছবি সেভাবে ছাপাও হয় না। টিভিতেও অন্য মন্ত্রী হিসেবে অরূপের কার্যকলাপ সেভাবে আলোচনায় আসে না।

২০১৬ থেকে ২১— এই পাঁচ বছর অরূপ বিশ্বাস ছিলেন রাজ্যের পূর্তমন্ত্রী। হ্যাঁ, পূর্তমন্ত্রী। কোথায় পূর্তমন্ত্রী আর কোথায় ক্রীড়ামন্ত্রী। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাঞ্চন মল্লিকের যতখানি তফাত, পূর্ত দপ্তরের সঙ্গে ক্রীড়াদপ্তরের তফাত তার থেকেও বেশি। আচ্ছা, ওই পাঁচ বছরে তাঁকে কটা রাস্তা উদ্বোধন বা সেতু উদ্বোধন করতে দেখেছেন?‌ উদ্বোধন না হয় তাঁর কপালে জোটে না। পরিদর্শনেও তো যেতে পারতেন। নিদেনপক্ষে ক্লাবের গ্যালারি পরিদর্শনেও তো যেতে পারতেন। হয়তো গেছেনও। কিন্তু কাগজে তাঁর পরিচয় ছাপা হয়েছে ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবেই।

২০২১ থেকে তাঁর দপ্তর কী?‌ বিদ্যুৎ ও আবাসন। এই দুটো দপ্তরের ওজন বোঝেন?‌ এই দুটো দপ্তরের তুলনাতেও ক্রীড়াদপ্তর কার্যত কিছুই নয়। অনেকটা প্রসেনজিতের সঙ্গে সোহম চক্রবর্তীর যতটা তফাত। কিন্তু বেচারা অরূপ। কেউ তাঁকে বিদ্যুৎমন্ত্রী বা আবাসন মন্ত্রী হিসেবে চিনলই না। কাগজে ছবি ছাপানোর ব্যাপারে তাঁর ‘‌আগ্রহ’‌ মারাত্মক। ইচ্ছে করেই ‘‌আগ্রহ’‌ শব্দ লিখতে হল। আসলে যে শব্দটা লেখা উচিত, সেটা অন্তত একজন মন্ত্রীর জন্য শোভনীয় নয়। তিনি পাড়ার খুঁটি পুজোয় গেলেও তাঁর আমচা–‌চামচারা সাংবাদিকদের ছবি পাঠিয়ে, ফোন করে অতিষ্ট করে দেন (‌এটা অবশ্য আমজনতার জানার কথা নয়)‌। সেই প্রেস রিলিজেও অধিকাংশক্ষেত্রে তাঁর পরিচয় হিসেবে ‘‌ক্রীড়ামন্ত্রী’‌ই লেখা হয়।

আসলে, পূর্ত দপ্তরের ওজন কত, অরূপ সেটা বুঝে উঠতেই পারেননি। বিদ্যুৎ বা আবাসন দপ্তরের মূল্য কতটা, সেটাও বোঝেননি। পাড়ার কাউন্সিলরকে মন্ত্রী বানিয়ে দেওয়া যায়, একগুচ্ছ দপ্তর দিয়েও দেওয়া যায়। কিন্তু তার মূল্য বুঝতে গেলে একটু ম্যাচিওরিটি লাগে। আর ম্যাচিওরিটি থাকলে তারকার পাশে দাঁত কেলিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া যায় না। শুধু কি মেসি!‌ একটু স্মৃতি ঝাঁকান। কার পাশে তাঁর ছবি নেই!‌ অমিতাভ, শাহরুখ থেকে শচীন, সৌরভ— যেখানেই তারকা দেখেছেন, পাশে দন্ত বিগলিত করে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। এঁরা না হয় বড় মাপের তারকা, মিমি, শ্রাবন্তীদেরও রেহাই নেই। তাঁদের পাশেও কী অক্লেশে দাঁড়িয়ে পড়েন। এমনকী কেউ একটা পদক জিতে ফিরলে তাঁর লোকেরা পাকড়াও করে এনেছেন নিউ সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ে। মন্ত্রীর সঙ্গে ছবি তুলতেই হবে। তিনি ফুলের তোড়া নিয়ে রেডি। পরেরদিন ছবি চাই। ফটোগ্রাফার না এলেও ক্ষতি নেই। তাঁর লোকেরাই পাঠিয়ে দেবেন। আর ছাপার জন্য তদ্বির করে যাবেন।

সেই অরূপ তাহলে পদত্যাগ করলেন!‌ অনেকে ভাবতেই পারেন, তাঁর হয়তো শাস্তি হল। কিন্তু এ যে কতবড় প্রোমোশন, অরূপ নিজেও জানেন না। এতদিন লেখা হত ‘‌ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস’‌। এবার অন্তত লেখা হবে ‘‌বিদ্যুৎমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস’‌। ডিমোশন না প্রোমোশন?‌

 

Previous post জটায়ু আসলে কে? হাইলি সাসপিসিয়াস
Next post ‘রসুন’ সংস্কৃতির আসল জন্মদাতা কিন্তু হেমন্তই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *