রক্তিম মিত্র
হয় দশের নীচে, নইলে দেড়শোর বেশি। ভোটের আগে বারবার এই কথাটাই বলে আসছিলেন প্রশান্ত কিশোর। দেখা গেল, একেবারে সঠিক অনুমানই করেছিলেন। তাঁর দলের আসন দশের নীচে তো বটেই, এমনকী শূন্যর গন্ডিও অতিক্রম করতে পারেনি।
মনে করা হয়েছিল, জনসুরাজ পার্টি যদি বেশি আসন নাও পায়, অধিকাংশ আসনেই বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। দুই শিবিরেরই ভোট কেটে অদ্ভুত একটা সমীকরণ তৈরি করে ফেলতে পারে জনসুরাজ। দেখা গেল, সেটাও হল না। তাঁর দলের ভোট সাড়ে তিন শতাংশেরও কম। কাউকেই তেমন বিপাকে ফেলতে পারেননি।
এমনকী কয়েকমাস আগে হওয়া উপনির্বাচনে যাও বা দশ শতাংশের মতো ভোট এসেছিল, এবার সেটাও আসেনি। হঠাৎ কী এমন হল যে, পিকে–র যাবতয়ী হাওয়া এভাবে উবে গেল?
নিজের ক্ষেত্রে ভবিষ্যদ্বাণী ফলে গেলেও নীতীশ কুমারের দল সম্পর্কে যে ভবিষ্যবাণী করেছেন, তা একেবারেই মেলেনি। বলেছিলেন, নীতীশ কুমারের দল ২৫ এর বেশি আসন পাবে না। অথচ, তার তিন গুনেরও বেশই আসন নিয়ে দশমবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথ নীতীশ কুমার।
কিন্তু তার পরেও বলতে হবে, তিনি বড় একটা ফ্যাক্টর। শুরু থেকে শেষ, প্রচারকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ধর্মের সুড়সুড়ি দিতে দেখা যায়নি। জাতিভেদ উস্কে দেওয়ার কোনও চেষ্টাই করেনি। বাকি দল যখন হিন্দু–মুসলিম আর উঁচু জাত–নীচু জাতের বিভাজনে মগ্ন, তখন তিনি লাগাতার শুনিয়ে গেছেন কর্মসংস্থানের কথা। বারবার দেখিয়েছেন নতুন দিশা। মনে হয়েছে, রাজ্য প্রশাসন চালাতে গেলে এই মাপের লেখাপড়া ও পরিণতি বোধ থাকা দরকার। তাঁর শিক্ষাদীক্ষা, কথাবার্তার কাছে বাকিদের বড়ই ম্লান মনে হয়েছে।
কোথায় গলদ, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। কোন পথে রাজ্যের উন্নয়ন সম্ভব তার একটা স্পষ্ট রূপরেখাও যেন তৈরি। যেগুলো বলছেন, বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, ভরসা হয়। অন্তত আর কোনও নেতা এই পর্যায়ের স্বপ্ন দেখাতে পারেননি। শুধু বিহার নয়, গোটা দেশে এমনটা দেখা যায়নি।
যা যা বলেছেন, কথা রেখেছেন। বলেছিলেন, সবথেকে বেশি শিক্ষিত মানুষ তাঁর দলের প্রার্থী তালিকায় থাকবেন। অন্য দলে যখন মাফিয়ার দাপাদাপি, তখন তাঁর দলে শিক্ষিত, মার্জিত, জীবনবোধে পরিপূর্ণ মানুষের সমাগম। বলেইছিলেন, অন্য দল থেকে টিকিট না পাওয়া নেতাদের দলে নেবেন না। এই কথাটাও রেখেছেন। অথচ, তাঁর প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে গেছেন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এমন প্রবল প্রতাপশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বড়ই ভীরু ও কাপুরুষ মনে হয়েছে তাঁর কাছে।
এরপরেও তাঁর আসন শূন্য। যথারীতি গোদি মিডিয়া লাফিয়ে পড়েছে। বিরাট উল্লাস। প্রশান্ত কিশোর কি রাজনীতি ছাড়ছেন?
না, এত সহজে সরে যাওয়ার বান্দা তিনি নন। অন্তত আরও পাঁচটা বছর তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। ডাক শুনে কেউ না এলে তিনি একলাই চলবেন। কে বলতে পারে, পাঁচ বছর পর বিহারে অন্য এক ইতিহাস লেখা হবে না!
