রক্তিম মিত্র
বাড়ি তাঁর আগরপাড়ায়। এফআইআর হল পুরুলিয়ায়। সেখানকার পুলিশ এসে আগরপাড়া থেকে তুলে নিয়ে গেলেন সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কে সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়? কেউ কেউ বলতে পারেন, কংগ্রেস নেতা। আসলে, তিনি একজন প্রতিবাদী সাংবাদিক। কংগ্রেস নেতা হওয়ার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। সাহসী সাংবাদিকতার জন্যই তাঁকে হেনস্থা করা হচ্ছে।
হঠাৎ পুরুলিয়ায় এফআইআর কেন? তিনি কি পুরুলিয়ায় গিয়ে টাকা তুলে এনেছিলেন ? সেখানে কাউকে প্রতারণা করেছিলেন ? আসলে, শুধু পুরুলিয়া নয়, রাজ্যের নানা প্রান্তে তাঁর নামে এফআইআর করা হয়েছিল। বলা ভাল, করানো হয়েছিল। পুরুলিয়ায় যিনি এফআইআর করলেন, আর মেদিনীপুরে যিনি এফআইআর করলেন, দুজনের মাথা কিন্তু এক। দুজনেই বিশেষ কারও নির্দেশে এফআইআর করলেন।
সত্যিই, আমাদের পুলিশ কত তৎপর। টিভিতে কে কী বক্তব্য রাখছেন, তার জন্য পুরুলিয়া থেকে কলকাতায় বাহিনী নিয়ে এসে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে হল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ কী? শাসকদলের ভাষায়, তিনি নাকি শাসকদলের নামে অপপ্রচার করছিলেন। তিনি নাকি মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করছিলেন।
কী অদ্ভুত এক রাজ্যে আমরা বাস করছি। এখানে মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রীদের যুক্তিপূর্ণ সমালোচনা করা চলবে না। প্রশাসনের গাফিলতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া চলবে না। একের পর এক কাগজ, চ্যানেলের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর দলবল যাই করুক, কিছু বলা চলবে না। উল্টে কে কত স্তাবকতা করতে পারে, তার নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা। এই মেরুদণ্ডহীনতার আবহে স্বতন্ত্র এক কণ্ঠস্বর ছিল সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। শাসকদলের একের পর এক দুর্নীতিকে সামনে এনেছেন। তৃণমূলের নেতামন্ত্রীদের মতো এঁড়ে চিৎকার নয়, তথ্য ও যুক্তি দিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। শালীন ভাষাতেও, মার্জিত রুচিতেও কীভাবে সমালোচনা করতে হয়, সন্ময়বাবুকে দেখে শিখতে পারেন।
তিনি নাকি অপপ্রচার করতেন। কারা বলছেন? তাহলে, মুখ্যমন্ত্রীর ভাষাকে কী বলা হবে ? সন্ময়বাবু একজন শিক্ষিত, রুচিশীল মানুষ। তিনি হাজার চেষ্টা করলেও মুখ্যমন্ত্রীর মতো কদর্যভাষায় কথা বলতে পারবেন না। মুখ্যমন্ত্রী বা তৃণমূলের অন্যান্য মন্ত্রীদের নামেও যদি অপপ্রচারের এফআইআর করা হয়, পুলিশ সেই এফআইআর নেবে তো ? তাহলে সামান্য ইউটিউবে ভিডিও আপলোড করার জন্য সন্ময়বাবুরে এভাবে হেনস্থা করা হল কেন ? একেবারে পুরুলিয়া থেকে বাহিনী এনে ধরে নিয়ে যাওয়া হল কেন?
কার বা কাদের আঁতে ঘা লেগেছিল, বুঝতে কারও বাকি নেই। কোন কোন চাকে তিনি ঢিল মেরেছিলেন, একটু ভিডিওগুলো দেখলেই বোঝা যাবে। পুরুলিয়ায় যে লোকটি এফআইআর করলেন, তিনি তো নিতান্তই হাতের পুতুল। তিনি জানেনও না, কার নামে কেন এফআইআর করা হচ্ছে। তিনি হয়ত জানেনও না, কে এই সন্ময় ব্যানার্জি।হয়ত কারও নির্দেশে করেছেন।
পাড়ার লাল্টু, পল্টুকে চমকানো একজিনিস। আর সন্ময় ব্যানার্জিকে গ্রেপ্তার অন্য জিনিস। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁর ভিডিও দেখেন। তাঁর লেখা পড়েন। এত এত মানুষের প্রতিবাদের ঝড় আছড়ে পড়বে সোশ্যাল মিডিয়ায়।প্রশাসন সেই ঝড় সামাল দিতে পারবে তো ? তাঁকে যতই কংগ্রেস নেতা বলে চালানো হোক, তিনি আসলে একজন সাংবাদিক। কংগ্রেসের কোনও কর্মসূচির জন্য তাঁর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সাংবাদিক হিসেবে তিনি যেভাবে অজানা তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে আনতেন, তারই শিক্ষা দিতে চেয়েছে শাসকদল। আজ না হোক কাল, এর জন্য কড়া মাশুল দিতে হবে।
লোকসভায় এমন বিপর্যয়ের পরেও শিক্ষা হল না! একজন প্রতিবাদী সাংবাদিকের দিকে পুলিশ লেলিয়ে দিতে হল! হয়ত মুখ্যমন্ত্রী জানেন না। তাঁকে খুশি করতে কেউ কেউ অতি সক্রিয় হয়ে এই কাজ করেছেন। কিন্তু এতে কার মুখ পুড়ছে ? যে প্রভাবশালীর নির্দেশে এমন কাণ্ড হল, তিনি হয়ত দুদিন পর বিজেপিতে চলে যাবেন। তাঁর সব দোষ তখন মাফ। কিন্তু একের পর এক পাপের বোঝা মুখ্যমন্ত্রীকেই বইতে হবে। এরপরেও মুখ্যমন্ত্রী যদি চক্রান্তটা না বোঝেন, তাহলে অশেষ দুর্গতি তাঁর জন্যও অপেক্ষা করছে।
এখনও সময় আছে। আইন যথার্থই আইনের পথে চলুক। কারা সন্ময়বাবুকে হেনস্থা করলেন, তাঁদের চিহ্নিত করা হোক। কার নির্দেশে এইসব বানানো এফআইআর, খুঁজে বের করা হোক। এবং যদি সৎসাহস থাকে, সেই পালের গোদাকে গ্রেপ্তার করা হোক। নইলে, বুঝতে হবে, মুখ্যমন্ত্রী সত্যিই বড় অসহায়।