স্বরূপ গোস্বামী
জোট ভেস্তে যাওয়ায় নানা মহলে হাহুতাশ শোনা যাচ্ছে। বাম বিরোধীরা যেমন নানা কটাক্ষ ছুঁড়ে দিচ্ছেন, তেমনি বামমনষ্করাও মনে মনে কিছুটা বোধ হয় হতাশ। ভাবছেন, এবার বোধ হয় সত্যিই খুব খারাপ পরিণতি অপেক্ষা করছে।
কিন্তু এই জোট ভেস্তে যাওয়াটা বামেদের পক্ষে শাপে বর হতে চলেছে। এই জোট সত্যিই হওয়ার ছিল না। তবু কেন বাম নেতৃত্ব এতদিন ধরে এত সময় অপচয় করলেন, সেটাই বিস্ময়ের। জোট না হওয়ার খারাপ দিক নিশ্চয় কিছু আছে। কিন্তু আপাতত ভাল দিকগুলোতে চোখ বোলানো যাক। নানা সম্ভাবনায় একটু উকি দেওয়া যাক।
১) মালদার দুটি ও মুর্শিদাবাদের তিনটি। সেইসঙ্গে ধরে নিলাম রায়গঞ্জ। এর বাইরে আর কোনও আসনে কংগ্রেস তৃতীয় হতে পারবে? অনিবার্যভাবে চতুর্থস্থান বরাদ্দ থাকবে তাদের জন্য। এমনকী, এই ছটির মধ্যেও দু–তিনটিতে হয়ত চতুর্থ স্থান জুটতে পারে। এই বাস্তব পরিণতিটা কি কং নেতৃত্ব বুঝতে পারছেন? না বুঝলে, এবার বুঝে যাবেন।
২) বিয়াল্লিশটি আসনের মধ্যে অন্তত তিরিশটিতে কংগ্রেসের ভোট পঞ্চাশ হাজারের নিচেই থাকবে। লোকসভায় কটা আসনের ফয়সালা পঞ্চাশ হাজারের নিচে হবে? তাই এইসব কেন্দ্রে কংগ্রেসের পাওয়া ভোটে ফলাফলের তেমন ফারাক হবে না। তাছাড়া, জোট হলেও, একটি আসনেও কি নিশ্চিত করে বলা যেত যে বামেরা জিতবেই। হয়ত জোট হলেও বামেদের ঝুলি শূন্যই থাকত। তার থেকে একা লড়ে শূন্য পাওয়া ঢের ভাল।
৩) কংগ্রেস আলাদা প্রার্থী দিলে, কংগ্রেসের ভোট অন্তত কংগ্রেসে পড়বে। এতে বামেদের লাভই হবে। কারণ, জোট হলে কংগ্রেসের এইসব ভোট বামেদের ঝুলিতে কতটুকুই বা আসত? ধরা যাক, কোথাও কংগ্রেসের মোট ভোট চল্লিশ হাজার। মেরেকেটে দশ হাজারও বামেদের ঝুলিতে আসত কিনা সন্দেহ। এখানেও সেই মেরুকরণ হয়ে যেত। মুসলিম ভোট হয়ত চলে যেত তৃণমূলের দিকে। হিন্দু ভোট চলে যেত বিজেপির দিকে। অর্থাৎ, কংগ্রেসের ভোট বামেদের দিকে যত না আসত, বিজেপি শিবিরে তার থেকে অনেক বেশি যেত।
৪) শুধু তাই নয়, বামেদের ভোটও কি পুরোপুরি কংগ্রেসের ঝুলিতে পড়ত? অনেকেই হয়ত তৃণমূলকে হারাতে বিজেপিকেই বেছে নিতেন। যা বিজেপিকে দ্বিতীয় হওয়ার দিকে অনেকটা এগিয়ে দিত। এমনকী কোথাও কোথাও বিজেপির জয়ের রাস্তাও প্রশস্ত করত।
৫) সবমিলিয়ে দেখা যেত, কংগ্রেস হয়ত দুটো বা তিনটে আসনে জিতল, বামেরা হয়ত কোথাও জিতল না। আবার কংগ্রেস বলতে শুরু করত, বামেরা নেই। ২০২১ বিধানসভা জোটের সময় কংগ্রেস হয়ত আড়াইশো আসন চেয়ে বসত। বামেদের জন্য হয়ত মেরেকেটে পঞ্চাশটি বরাদ্দ করত। কারণ, তখন কার কত সংগঠন দেখা হত না, আসন সংখ্যাই দেখা হত।
৬) তাছাড়া, কংগ্রেসের কাদের জেতাবেন? অধীরকে নিয়ে প্রশ্ন এই। তাঁর তৃণমূল বিরোধিতা নিয়েও প্রশ্ন নেই। কিন্তু বাকিরা? মালদার ডালুবাবু তো কদিন আগেও তৃণমূলের সঙ্গে জোটের জন্য সওয়াল করেছেন। একেবারে সাতসকালে পার্থ চ্যাটার্জির বাড়িতেও পৌঁছে গিয়েছিলেন। অভিজিৎ মুখার্জি। এই কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থীর দিকে তাকান। এই একটি কেন্দ্র তৃণমূল নিশ্চিতভাবেই উপহার দিতে চাইছে। যাঁকে জেতানোর দায়িত্ব তৃণমূল নিয়ে ফেলেছে, তাঁকে জেতানোর জন্য বামেরাও ঝাঁপিয়ে পড়বেন!
৭) তাছাড়া, জোট করব, অথচ জোট বলব না। আসন সমঝোতা বলব। এরকম ধরি মাছ, না ছুঁই পানি বামেদের কাছেও কাম্য নয়। কেরলে লড়াই হবে, এখানে জোট হবে, এটা নিয়েও ধোঁয়াশা থাকত। তার থেকে নিজেদের শক্তিতে লড়াই হোক। কী ফল হয়, দেখাই যাক না।
৮) বিধানসভায় কংগ্রেসের কজন জিতেছিলেন? ৪৪ জন। এখন কজন কংগ্রেসে আছেন, তা কং নেতারাও বলতে পারবেন না। কুড়িজনও আছেন কিনা সন্দেহ। যাঁরা আছেন, তাঁদের নিয়েও গুঞ্জনের শেষ নেই। তলায় তলায় আরও অনেকেই পা বাড়িয়ে আছেন। বিধানসভার আগে দেখবেন আরও অনেকেই চলে গেছেন। শেষমেষ হয়ত দশজনও টিকবেন না। এরপরেও কি শিক্ষা হবে না?
৯) লোকসভায় জিতলে সরাসরি হয়ত তৃণমূলে যাওয়ার সমস্যা। কিন্তু নীরব হয়ে থাকতে তো সমস্যা নেই। যেমন, অভিজিৎ মুখার্জি, আবু হাসেম খানচৌধুরি, মৌসম নুর। তৃণমূল বিরোধী অবস্থানে গত পাঁচ বছরে তাঁদের কবার দেখা গেছে? এর মধ্যে মৌসম তো আগেই চলে গেছেন। বামেদের সঙ্গে জোট হবে না জানলে, ডালুবাবু ও অভিজিৎ–ও হয়ত চলেই যেতেন।
১০) ১৯৭৭। সেবার জনতা দলের সঙ্গে বামেদের জোট হওয়ার কথা ছিল। বামেরা অনেক বেশি আসন ছেড়েছিল জনতা দলকে। এমনকী, জনতা দল থেকে মুখ্যমন্ত্রী করা হবে, এমন শর্তও কার্যত মেনে নিয়েছিল। তারপরেও আসন রফা থেকে ইস্তেহার, কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। জোট ভেঙে গিয়েছিল। একাই লড়াই করেছিল বামফ্রন্ট। ফল কী হয়েছিল, কারও অজানা নয়। এবারও তেমন কিছু মিরাক্যাল অপেক্ষা করছে কিনা, কে বলতে পারে!


