ইন্দ্রজিৎ দাশগুপ্ত
খুব উত্তাল সময় বলা যাবে না। নানাক্ষেত্রের স্বর্ণযুগও বলা যাবে না। তবে, আমাদের অনেকের বেড়ে ওঠার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আশির দশক। বেঙ্গল টাইমসের বিভিন্ন আঙ্গিকের লেখা পড়ছি। নস্টালজিয়ায় ভেসে যেতে মন্দ লাগছে না। সেদিন পড়লাম যতীন চক্রবর্তীকে নিয়ে। মনে হচ্ছিল, কাকে নিয়ে লেখা যায়। হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমার প্রিয় প্রধানমন্ত্রীর নাম। হ্যাঁ, তিনিও আটের দশকেই প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।
সেরা প্রধানমন্ত্রীর তালিকা পুরনো দিনের অনেকেই রাখেন ইন্দিরা গান্ধীকে। কেউ রাখবেন নেহরুকে। পরের দিকে কেউ কেউ এগিয়ে রাখেন বাজপেয়ীকে। যাঁরা অতীতের খোঁজখবর একেবারেই রাখেন না, তাঁরা আবার মোদি ছাড়া কিছুই বোঝে না। যে যাই হোক, আমার প্রিয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং। যিনি ভিপি সিং নামে বেশি পরিচিত। মাত্র এগারো মাস প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রী কতখানি দৃঢ়চেতা হতে পারেন, তার দৃষ্টান্ত ভিপি সিং। তাঁর আগে ও পরে আরও কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী দেখেছি, কিন্তু কেন জানি না, ওই জায়গায় অন্য কাউকে বসাতে পারি না।
নিজের কুর্সি টিকিয়ে রাখার জন্য কত মানুষকে কত আপস করতে দেখেছি। কত ঢোঁক গিলতে দেখেছি। কিন্তু এই একটি মানুষ। দেশের অখণ্ডতার জন্য, প্রধানমন্ত্রিত্ব ছুঁড়ে ফেলতে। একটু ছোট্ট আপস করলেই থেকে যেতে পারতেন। কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রীর যা করা উচিত, ঠিক সেটাই করেছিলেন। উইকিপিডিয়া ঘাঁটলে তাঁর সম্পর্কে নানা অজানা কথা লেখা যায়। কিন্তু এখানে তাঁর রচনা লিখতে বসিনি। তাই অহেতুক লেখার কলেবর বাড়ানোর ইচ্ছেও নেই। ছিলেন মান্ডার রাজা। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। আর্থিক সততা নিয়ে অতিবড় বিরোধীও প্রশ্ন তুলতে পারেননি। যখন বোফর্স নিয়ে গোটা দেশ উত্তাল, এক লহমায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেন। যে কংগ্রেস ৪১৪ আসন নিয়ে ৮৪ তে ক্ষমতায় এসেছিল, তারা নেমে এল দুশোর নিচে। কংগ্রেস বিরোধী সেই আন্দোলনের প্রধান মুখ ছিলেন ভিপিই।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একের পর এক দৃঢ় সিদ্ধান্তে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাকিদের থেকে তিনি কতটা আলাদা। মন্ডল কমিশনের জন্য অনেক গালমন্দ শুনতে হয়েছে। কিন্তু পিছড়ে বর্গের জন্য এভাবে আর কে ভেবেছেন? কে তা সাহস নিয়ে বাস্তাবায়িত করেছেন? সামাজিক ন্যায়ের যে বার্তা সেদিন ভিপি দিয়েছিলেন, সব দলের মুখেই এতবছর পরেও তারই অসহায় প্রতিধ্বনি। কই, কেউ তো খারিজ করতে পারলেন না!
এরপর এল সেই বহু বিতর্কিত রাম মন্দির ইস্যু। বিজেপি–র ৮৮ সাংসদের সমর্থন ছিল বাইরে থেকে। আদবানিরা ভেবেই নিয়েছিলেন, যাই করুন, বাধা আসবে না। বাধা এলেই সমর্থন তুলে নেওয়ার হুমকি দেবেন। বেরোলো আদবানির রথ। যে পথ দিয়ে গেল, সেই পথেই দাঙ্গা। শুধু ধর্ম নিরপেক্ষতার বাণী আওড়াননি। সমস্তিপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হল আদবানিকে। ফল কী হবে, বিলক্ষণ জানতেন। সেই বিকেলেই সমর্থন তুলে নিল বিজেপি। চাইলে সরকার বাঁচাতে পারতেন। আস্থা ভোটে পার্লামেন্টে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ঐতিহাসিক মর্যাদার দাবি রাখে। সেদিন ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে কোনও আপস করেননি এই প্রধানমন্ত্রী। জোর গলায় বলেছিলেন, সরকার গেলে যাক, কিন্তু দেশ অখণ্ড থাকুক। দেশের মর্যাদা অটুট থাকুক। তাই প্রধানমন্ত্রিত্বকে ছুঁড়ে ফেলতে সময় নেননি। দেশের আর কোন প্রধানমন্ত্রী এই দৃঢ়তা দেখিয়েছেন? জনতা ভেঙে চন্দ্রশেখরের সরকার হল। চার মাসের মাথায় সেটাও পড়ে গেল। তারপর নরসীমা সরকার। পাঁচ বছর পরে (৯৬) দেশে আবার পরিবর্তনের ঝড়। সেবারও প্রধানমন্ত্রী পদে সবথেকে গ্রহণযোগ্য দুই নাম ভিপি সিং ও জ্যোতি বসু। জ্যোতি বসুর ক্ষেত্রে দল রাজি হল না। আর ভিপি! হাঁসতে হাঁসতে এবারও প্রধানমন্ত্রির কুর্সিকে গুডবাই করলেন। কে দেখাতে পারতেন এই সংযম!
এই আলোচনাকে বর্তমান সময়ে টেনে আনতে চাই না। শুধু বলতে চাই, আশির দশক সেই দশক যখন এমন একজন দৃঢ়চেতা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। প্রচারের ঢক্কানিনাদ ছিল না। আমিত্বের দম্ভ ছিল না। ছিল নিঃশব্দ সেই প্রতিবাদ। নিঃশব্দে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছুঁড়ে ফেলার সেই অঙ্গিকার। এখনকার রাজনীতি সত্যিই বড় দুর্ভাগা, যদি একজন ভিপি সিং থাকতেন!
(সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুলিখন)
(বেঙ্গল টাইমসের জনপ্রিয় বিভাগ— আশির দশক: ফিরে দেখা। আজকের লেখায় আশির দশকের এক দৃঢ়চেতা প্রধানমন্ত্রীর কথা। সেই দশকের এমন অনেক চরিত্র উঠে আসতে পারে। আপনিও লিখতে পারেন আপনার প্রিয় চরিত্রের কথা। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: bengaltimes.in@gmail.com)

