রবীন্দ্রনাথ ঘটি না বাঙাল?

ময়ূখ নস্কর

রসগোল্লা বাংলার মিষ্টি না ওড়িশার? সবাই জানে বাংলার। কিন্তু ইদানীং ওড়িশা দাবি করে বসেছে রসগোল্লা নাকি তাদের সৃষ্টি। এই নিয়ে কোর্ট-কাছারি হওয়ারও উপক্রম হয়েছে। আসলে মানুষের স্বভাবই এই রকম। যা কিছু ভালো, যা কিছু মহৎ তার সঙ্গে মানুষ নিজেকে যুক্ত করতে চায়।
শুধু রসগোল্লা নয়, কবি জয়দেবের জন্ম কোথায় তা নিয়েও বাংলা আর ওড়িশার মধ্যে বিবাদ আছে। আমরা জানি জয়দেবের জন্ম বীরভূমের কেন্দুলিতে। কিন্তু ওড়িশা তা কিছুতেই মানতে রাজি নয়। আবার প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠ কবি কালিদাসের জন্ম কোথায় তা নিয়েও ধোঁয়াশা আছে। অনেকে বলেন, তিনি নাকি বাঙালি ছিলেন।
ভারতের বাইরেও এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। প্রাচীন গ্রিসের শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন হোমার। স্বাভাবিকভাবেই সেদেশের মানুষের প্রচণ্ড গর্ব ছিল হোমারকে নিয়ে। প্রাচীন গ্রিসের সাতটি নগরের সকলেই দাবি করত হোমার তাদের সন্তান।
এ সবই তো গেল প্রাচীন যুগের কবিদের কথা। কিন্তু আমাদের যুগের শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ? তিনি কোথাকার সন্তান ছিলেন? আসুন রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ে তার কিছু সুলুক সন্ধান জানার চেষ্টা করি। জানার চেষ্টা করি তিনি ঘটি না বাঙাল?

rabindranath
একটা অনুরোধ, এই লেখাটাকে নিছক মজা হিসাবেই দেখবেন। মনে রাখবেন, রবীন্দ্রনাথ শুধু বাঙালির নন সমগ্র মানব সভ্যতার সম্পদ। তাঁকে নিয়ে আমাদের-ওদের ইত্যাদি টানাটানি করবেন না। আসলে আমাদের মানে বাঙালিদের সব ব্যাপারেই রবীন্দ্রনাথকে না হলে চলে না। আবার আমরা বাঙালিরা সব ব্যাপারেই অমুক বনাম তমুক ঝগড়া না করে থাকতে পারি না।
এই ঝগড়ার অন্যতম হল, ঘটি বনাম বাঙাল। মাঝে মাঝে এই ঝগড়া অশ্লীল-কুৎসিত-হিংস্র হয়ে পড়ে ঠিকই। কিন্তু এই অসভ্যতাগুলো বাদ দিলে, ঘটি-বাঙ্গালের দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া বঙ্গজীবনের অঙ্গ। মজা হিসাবে দেখলে এই ঝগড়া বেশ উপভোগ করা যায়। আমার ধারনা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও এই ঝগড়ার কথা জানতেন।

silaidaha

ঠাকুর পরিবারের জমিদারি ছিল পূর্ববঙ্গের শিলাইদহে। জমিদারির কাজে রবীন্দ্রনাথকে প্রায়ই সেখানে যেতে হত। রবীন্দ্রনাথের লেখায় তাই পূর্ববঙ্গের বর্ণনার ছড়াছড়ি। আবার, ঠাকুর পরিবারের বাসস্থান ছিল কলকাতায়। রবীন্দ্রনাথের লেখায় পশ্চিমবঙ্গের টান যথা ‘গিয়েছিলেম’, ‘তাকালুম’ ‘পাচ্চিনে’ ইত্যাদি লক্ষ্য করা যায়। শিশু ভোলানাথে নিজের নাম বলেছেন, ‘অবু’। রবীন্দ্রনাথের লেখায় খেলাধুলার বিশেষ উল্লেখ না থাকলেও ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ইংরাজি ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে লেখা দুই বোন উপন্যাসে মোহনবাগানের নাম পাওয়া যায়। খেয়াল রাখুন, ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে, অর্থাৎ ততদিনে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের জন্ম হয়ে গিয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন তো মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের নয়। প্রশ্ন হল তিনি ঘটি না বাঙাল। ঠাকুর পরিবারের বংশলতিকা ঘাঁটলে দেখা যাবে তারা পূর্ববঙ্গের লোক। অতি অবশ্যই বাঙাল। ঠাকুর পরিবারের আসল পদবি কুশারি। তাদের আদি বাসস্থান ছিল যশোরে। পলাশীর যুদ্ধের পর, তাঁদের এক পূর্বপুরুষ কলকাতায় এসে বাস করতে শুরু করেন। জাতে ব্রাহ্মণ বলে তাঁরা ঠাকুর বলে পরিচিত হন।

রবীন্দ্রনাথের জন্মের অনেক আগেই ঠাকুররা ‘খাঁটি কলকাত্তাইয়া’ হয়ে গেছিলেন। কিন্তু এই বাড়ির বউদের অনেকেই ছিলেন পূর্ববঙ্গের মেয়ে। রবীন্দ্রনাথের না সারদাসুন্দরী দেবী ছিলেন যশোরের মেয়ে। সুতরাং রবীন্দ্রনাথকে আজকের ভাষায় ‘বাটি’ বলা যেতে পারে। না বাটি কেন, পিতৃপুরুষের আদিবাড়ি যশোরে, সুতরাং তাঁকে পুরোপুরি বাঙাল বললেও ভুল হবে না। শুধু মা কেন? রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর বাপের বাড়িও ছিল খুলনা।
এত তথ্যের পরেও রবীন্দ্রনাথ ঘটি না বাঙাল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন? উঠছে কারণ, প্রশ্নটা তুলে দিচ্ছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তথ্য কী বলছে তার থেকেও বড় কথা রবীন্দ্রনাথ নিজে নিজেকে কী মনে করতেন? ঘটি না বাঙাল? আসুন রবীন্দ্রনাথের কিছু লেখা ঘেঁটে দেখি। রবীন্দ্রনাথের মনের কথা আমরা কেউ জানি না। তাই এখানে কেবল উদ্ধৃতি দেওয়া হবে। ব্যাখ্যার দায়িত্ব আপনার।
১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রীকে এক চিঠিতে লিখছেন,
“ভাই ছোট বউ-
যেমনি গাল দিয়েছি অমনি চিঠির উত্তর এসে উপস্থিত।…… একেই তো বলে বাঙ্গাল। ছি, ছি, ছেলেটাকে পর্যন্ত বাঙ্গাল করে তুললে গা!”
অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ বলছেন, তাঁর স্ত্রী বাঙ্গাল। আর তিনি নিজে? আগেই বলেছি ব্যাখ্যার দায়িত্ব আপনার।

এর পর আসুন চোখ রাখি, চোখের বালি উপন্যাসের একটি অংশে ।
রাজলক্ষ্মী কহিলেন, “মেজোবউ, বামুনঠাকুরের কর্ম নয়, রান্নাটা তোমায় নিজে দেখাইয়া দিতে হইবে- আমাদের এই বাঙাল ছেলে একরাশ ঝাল নহিলে খাইতে পারে না। ”
বিহারী। তোমার মা ছিলেন বিক্রমপুরের মেয়ে, তুমি নদীয়া জেলার ভদ্রসন্তানকে বাঙাল বল? এ তো আমার সহ্য হয় না।

বিহারির এই কথাকে আমরা সমর্থন করি না। এই রসিকতার অন্তর্নিহিত অর্থ কী হতে পারে? বিক্রমপুরের মানুষ, নদীয়ার মানুষের মতো ভদ্র নয়? ভদ্রসন্তানকে কি বাঙাল বলা যায় না? আপনি অবশ্যই বলতে পারেন, এটা বিহারির কথা, রবীন্দ্রনাথের কথা নয়। ঠিকই বলেছেন। আমরাও তাই মনে করি। মাতৃসম এক মহিলাকে খেপানোর জন্য বিহারী যা বলেছে, সেটাকে রবীন্দ্রনাথের কথা ভাবলে মহাভুল হবে।
কিন্তু বিহারীর মুখে রবীন্দ্রনাথ এমন একটা সংলাপ বসালেন কেন? তবে কি তিনি নিজেও অন্যদের বাঙাল বলে খেপাতেন। ১৯৪০ সালে অর্থাৎ মৃত্যুর এক বছর আগে লেখা গুটিচারেক শিরোনামহীন ছোট কবিতা দেখে তেমনটাই মনে হয়।

এর মধ্যে একটি কবিতায় বলা হচ্ছে,
“সুধীর বাঙাল গেল কোথায়
সুধীর বাঙাল কৈ?
সাতটা থেকে আমার মুখে
নেই কথা এই বই।“

অন্য একটি কবিতায়,
“নাকের ডগা ঘসিয়া হাসে
দেয় না স্পষ্ট জবাব বাঙাল
কাজ করে সে ষোল আনার
খাতা এবং ছাপাখানার
মাঝখানে সে বাঁধে জাঙাল ।“

আরেকটি কবিতার শেষ দু’লাইন এরকম,
“মাথা চুলকে বাঙাল যখন সামনে এসে দাঁড়ায়
তখন তাহার মুখের ভাবটা উষ্মা তাঁহার তাড়ায়।“

তবে সবথেকে উল্লেখযোগ্য হল কবিতাটিতে কবি বলছেন,
“বাঙাল যখন আসে
মোর গৃহদ্বারে,
নূতন লেখার দাবি
লয়ে বারে বারে;
আমি তাঁরে হেঁকে বলি
সরোষ গলায়-
শেষ দাঁড়ি টানিয়াছি
কাব্যের কলায়।“
এবং শেষ দুলাইনে বলছেন,
“পশ্চিমবঙ্গের কবি দেখিলাম মোর
বাঙালের মতো নাই জেদের অপ্রতিহত জোর।“
মনে রাখবেন, তখনও বাংলা ভাগ হয়নি, কিন্তু কবি বলছেন, “পশ্চিমবঙ্গের কবি দেখিলাম মোর…”।

এই লেখাগুলো পড়ে এবং বংশলতিকা বিচার করে আপনারাই ঠিক করুন, রবীন্দ্রনাথ ঘটি না বাঙাল? তিনি নিজে নিজেকে কী ভাবতেন? আপনারাও ভাবুন। ভেবে উত্তর পাঠান, bengaltimes.in@gmail.com-এ।

তবে সবশেষে আবার বলছি, এই লেখাকে মজা বলেই ভাবুন। রবীন্দ্রনাথকে যতটা ঘটিদের ততটাই বাঙালদের। যতটা ভারতের, ততটাই বাংলাদেশের, ততটাই সারা পৃথিবীর।
“তোমার পায়ের পাতা সবখানে পাতা-
কোনখানে রাখব প্রণাম!“

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *