বৃষ্টি চৌধুরি
সৃষ্টির আদিকাল থেকে দুটো শব্দ যেন একসঙ্গেই উচ্চারিত হয়ে এসেছে— পুরুষ ও নারী। সেখান থেকেই নতুন প্রাণের সঞ্চার। পুরুষকে ছাড়া নারী যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনই নারীকে ছাড়া পুরুষও অসম্পূর্ণ।
শুধু আধুনিক ভারত নয়, যদি প্রাচীণ ভারতেও ফিরে যান, রাম বললেই আসে সীতার কথা। ঠিক যেমন, কৃষ্ণ বললেই উঠে আসে রাধার কথা।
নারীকে আমরা নানা ভূমিকায় দেখি। কখনও সে মা। কখনও বোন। কখনও প্রেমিকা, কখনও স্ত্রী। কখনও আবার মেয়ে। কখনও সে ঠাকুমা, কখনও সে নাতনি। নানা ভূমিকায় সে যেন গাছের ছায়ার মতো আগলে রেখেছে পুরুষকে। আমরা ছোট থেকেই যে শব্দটা বলতে শিখি, তা হল— মা। সেই মায়ের ভাষাই হয়ে ওঠে আমাদের ভাষা। আমাদের সবার বেড়ে ওঠার পেছনে বাবার যেমন ভূমিকা আছে, মায়ের ভূমিকা কোনও অংশে কম নয়। একজন মা যদি শিক্ষিত হন, তাঁর সন্তান কখনও অশিক্ষিত হতে পারে না।
আজ বিশ্ব নারী দিবস। সারা পৃথিবীতেই দিনটি পালিত হয়। একদিকে সমাজে নারীর ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে, নারীর অধিকারকে প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়। সমাজের সবক্ষেত্রেই নারী তার মতো করে এগিয়ে চলেছে। নারী শুধু স্নেহশীলা নয়, নারী শক্তির উৎস। রামায়নে আমরা দেখেছি, রাবন বধের আগে রামচন্দ্র যাঁর আরাধনা করেছিলেন, তিনি মা দূর্গা। দেশ যখন পরাধীন, তখনও আমরা পেয়েছি ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো নারীকে। এমনকী স্বাধীনতার পরেও ভারত–পাক যুদ্ধেও আমরা দেখেছি ইন্দিরা গান্ধীর মতো সাহসী রাষ্ট্রনায়ককে। গত বছর ভারত যখন আক্রান্ত, অপারেশন সিন্দুরের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সোফিয়া কুরেশির মতো বীর সেনানী। এই তো সেদিন, মহাকাশ থেকে ফিরে এলেন সুনীতা উইলিয়ামস।
যেদিকে চাইবেন, সেদিকেই নারীর জয়জয়কার। আজ টি২০ বিশ্বকাপের ফাইনাল। ভারতের হাতে বিশ্বকাপ উঠবে কিনা, আমরা এখনও জানি না। কিন্তু কয়েকমাস আগেই ভারতের মেয়েরা বিশ্বজয়ী হয়ে সারা বিশ্বের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। স্বাধীনতা দিবস এলেই এখনও বেজে ওঠে লতা মঙ্গেশকারের কণ্ঠে ‘সারে জাঁহাসে আচ্ছা/ হিন্দুস্তাঁ হামারা।’
কিন্তু তার পরেও নারীকে প্রাপ্য সম্মান জানাতে আমাদের কোথায় একটা কুণ্ঠা থেকে যায়। নারী তার প্রাপ্য সম্মান থেকে আজও বঞ্চিত। যিনি সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন, তাঁকে আমরা আজও ‘গৃহবধূ’ বলেই সম্বোধন করি। তাঁকে যদি আমরা ‘হোমমেকার’ বলি, কেমন হয়! লড়াইটা পুরুষ বনাম নারী নয়। নারীকে উপেক্ষার পিছনে নারীর ভূমিকাও কম নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন নারীর কৃতিত্বকে খাটো করে দেখানোর জন্য নারীরাই বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এই প্রবণতা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা নিজেরা যদি নিজেদের সম্মান করতে না পারি, অন্য কেউ কেনই বা সম্মান দেবে?
তাই এই দিনটা হয়ে উঠুক নারীর জাগরণের দিন। নানা ক্ষেত্রের কৃতী নারীদের মনে মনে কুর্নিশ করুন। যে যার নিজের নিজের মতো করে বেড়ে উঠুন। নিজের নিজের কাজের ক্ষেত্র বেছে নিন। নিজের স্বপ্নটাকে আরও বড় করুন। নারী বলে হীনমন্যতায় ভুগবেন না। গর্বের সঙ্গে বলুন, আমি নারী।
