প্রায় চার দশক ধরে বাংলা সিনেমার সঙ্গে যুক্ত তিনি, এক সময়ে কুখ্যাত খলনায়ক ছিলেন। পরিচিতির অনেকটা জুড়েই সেই খলনায়ক সত্ত্বা। তপন সিনহা থেকে সত্যজিৎ রায়, সৌমিত্র থেকে উত্তম, সকলের সঙ্গেই কাজ করেছেন তিনি। ছোট-বড় নানা চরিত্রে রেখে গেছেন তাঁর নিজস্বতার ছাপ।সিনেমায় আসা থেকে খলনায়ক হয়ে ওঠা, রাজনীতি থেকে সমাজসেবা কিংবা মনের মধ্যে থেকে যাওয়া পরিচালনার ইচ্ছা, সমস্ত কিছু সম্পর্কে নানা কথা বললেন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়। এক সন্ধ্যায় তাঁর মুখোমুখি বেঙ্গল টাইমসের দুই প্রতিনিধি শোভন চন্দ ও অয়ন দাস।।
সিনেমায় অভিনয়ের ইচ্ছে কি প্রথম থেকেই ছিল? সিনেমায় এলেন কীভাবে ?
বিপ্লবঃ হ্যাঁ, ছোট থেকেই অভিনয়ের নেশা ছিল । তৎকালীন দেশ পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেখলাম সত্যজিৎ রায় নতুন ছেলেদের নিয়ে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ নামে একটি সিনেমা করছেন। বিজ্ঞাপনটি দেখে সত্যজিৎবাবুর বাড়িতে যাই। তিনি বলেন একটি ছোট চরিত্র রয়েছে। সেই চরিত্রে প্রথম অভিনয় করা এবং এভাবেই সিনেমায় প্রবেশ।
সিনেমাতে খলনায়ক অর্থাৎ ভিলেনের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব কীভাবে পেলেন?
বিপ্লবঃ সত্যি বলতে তখন চেহারাটা হিরোদের মত ছিল না। এছাড়া সিনেমায় একজনকে তো ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করতে হত। সেই সময় আমরা স্বর্ণভিলা নামে একটা নাটক করতাম। সেই নাটকে মঞ্জু দে অভিনয় করতেন। তিনি বলেছিলেন, বিপ্লব তুমি ভিলেনের রোলটা ধরে রেখো। তোমার সুবিধে হবে। আমার ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করার এটাও একটা বড় কারণ।
এখনও মঞ্চে কাজ করে চলেছেন? মঞ্চে না সেলুলয়েডে নিজেকে কোথায় বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন?
বিপ্লবঃ অবশ্যই মঞ্চে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি। এখনও মঞ্চে অভিনয় করি। এই তো, কিছুদিন আগে করলাম –“stage is my first love”। আমি মনে করি, বলতে পার এটা আমার ধারণা যে, কোনও অভিনেতা বা শিল্পী স্টেজ না করলে কখনও ভালো অভিনেতা হতে পারেন না।
প্রশ্নঃ সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় সিনেমা করেছেন। আবার তাঁর পুত্র সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় “রয়্যাল বেঙ্গল রহস্য”তেও অভিনয় করেছেন। পিতা ও পুত্র উভয়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?
বিপ্লবঃ হ্যাঁ সত্যজিৎ রায়ের সাথে জয় বাবা ফেলুনাথ, প্রতিদ্বন্দ্বী করেছি। সত্যজিৎ রায় খুব বড় মাপের পরিচালক, তাঁর সঙ্গে কাজ করতে গেলে সব সময় মনে হত মাথার ওপর একটা ছাতা আছে। পান থেকে চুন খসলেই তিনি ধরিয়ে দিতেন। সন্দীপের কথা বলতে গেলে ওর টেকনিক্যাল পারদর্শিতা খুবই ভাল। ওদের একটা ঘরানা রয়েছে। আমার মনে হয় বাবার থেকে কোন অংশে সন্দীপ কম নয়।
প্রশ্নঃ পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সাথে কাজ করেছেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সম্পর্কে কী বলবেন?
বিপ্লবঃ আমার মনে হয়, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত প্রাইজ পাওয়ার জন্যই সিনেমা করেন। সেইভাবে সিনেমার সাবজেক্ট ও তৈরি করেন, এবং সত্যি বলতে তাঁর সিনেমাও প্রাইজ পায়। পরে যখন ছবিগুলি দেখেছি সে লাল দরজা কিংবা ফেরা, বুঝতে পেরেছি সিনেমাগুলি প্রাইজ পাওয়ার উপযুক্ত।
প্রশ্নঃ তপন সিনহার পরিচালনায় বাঞ্ছারামের বাগানে কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা কেমন?
বিপ্লবঃ তপন সিনহা দুরন্ত পরিচালক। আমার কপাল ভালো তাঁর সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। বাঞ্ছারামের বাগান সিনেমাটি কিংবা মনোজ মিত্রের অভিনয় আজও বাংলা সিনেমায় এক দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
প্রশ্নঃ অভিনেতা মনোজ মিত্রের সাথে কাজ করে কেমন লেগেছে?
বিপ্লবঃ বাঞ্ছারামের বাগানে মনোজদার সঙ্গে কাজ করেছি। বিশাল মাপের অভিনেতা , নানান ধরনের কাজ করেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে পরিচয় রয়েছে। তবে আমার মনে হয়, মনোজদার অভিনয় একই ধরনের। এখনও যা কাজ করেন কোথাও যেন একটা সেই বাঞ্ছারামের ছাপ রয়ে গেছে ।
প্রশ্নঃ এবার নতুন প্রজন্মের পরিচালকদের কথায় আসি। পরিচালক হিসেবে অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায়কে আপনার কেমন লাগে?
বিপ্লবঃ আগ্নিদেব সম্পর্কে বলব ও তো মূলত সিরিয়াল থেকে উঠে এসেছে। এমনিতে খুবই সভ্য ভদ্র নম্র। চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে না। এছাড়া সাবজেক্ট ভালো ধরে সিনেমাগুলো ভালো তৈরি করে।
প্রশ্নঃ আপনার পরিচালনায় সিনেমা রয়েছে, আপনি বলেছিলেন, পরিচালক হিসেবে কাজও করতে চান। কিন্তু অনেকদিন কোনও সিনেমার পরিচালনা করেননি চলচ্চিত্র পরিচালনার থেকে সরে আসার কারণ কী ?
বিপ্লবঃ হ্যাঁ ইচ্ছে তো রয়েছে। পরিচালক হিসেবে কাজও করতে চাই। কিন্তু সমস্যা রয়েছে। টাকা জোগাড় করে দাও, প্রোডিউসার দাও, সিনেমা করব।
প্রশ্নঃ বর্তমান পরিচালকদের কাজ দেখেছেন বাংলা সিনেমায় নানান বিষয়ের ওপর কাজ হচ্ছে। কৌশিক –সৃজিত এদের কাজ দেখেন?
বিপ্লবঃ আজকাল বেশি সিনেমা দেখা হয়ে ওঠে না। তবে নিশ্চয়ই কিছু পরিচালক ভালো কাজ করছেন। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় বেশ ভালো। আমি ওর সাথে কাজও করেছি ।
প্রশ্নঃ অতীতে বিশিষ্ট পরিচালকদের সাথে কাজ করেছেন। বর্তমানেও বাংলা সিনেমার অনেক পরিচালকের সাথে কাজ করেছেন । তখনকার পরিচালক ও এখনকার পরিচালকদের মধ্যে কী পার্থক্য লক্ষ্য করেন?
বিপ্লবঃ পার্থক্য বলতে আমার মনে হয় তখনকার দিনে পরিচালকরা অনেক গভীরে কাজ করতেন আর গল্পে একটা লজিক থাকত, এখনকার দিনে পরিচালকরা এত detail কাজ করতে চান না আর বেশির ভাগ গল্পেই কোন লজিক নেই।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সব্যসাচী চক্রবর্ত্তী না আবীর চট্টোপাধ্যায় “ফেলুদা” হিসেবে কাকে এগিয়ে রাখবেন?
বিপ্লবঃ আমি আবীরকে ফেলুদা হিসেবে এখনও দেখিনি। তবে সৌমিত্রদা আর সব্যসাচীর মধ্যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আমার প্রিয়। আমার মনে হয় উনি আলাদা মাপের অভিনেতা এবং ফেলুদা হিসেবে তিনি আজও বাঙালির মনে এক আলাদা জায়গা করে আছেন ।
প্রশ্নঃ আপনি তো এক সময় নবজাগরণ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলা ও বাঙালির অধিকার নিয়ে বেশ সোচ্চার ছিলেন। এখন তেমন সোচ্চার হতে দেখা যায় না।
বিপ্লবঃ হ্যাঁ, নবজাগরণ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সে এক সময় ছিল, বাড়ি বাড়ি যেতাম, লোকজনকে বোঝাতাম। তবে এখন সে সংগঠন আর নেই। আর আমার মনে হয় না এই কাজের তেমন কোন প্রভাব পড়েছে।
১৯৯৮, ২০০৬ দু’বার ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন,তারপর হঠাৎ রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ালেন কেন?
বিপ্লবঃ সত্যি বলতে রাজনীতির প্রতি আমার আর বিশ্বাস নেই। এই জন্য সরে এসেছি । প্রতিদিন মারপিট হচ্ছে। এ বলছে আমি মারিনি ও বলছে আমি মারিনি এইসব আর ভালো লাগে না ।
প্রশ্নঃ সরকার এখন চলচিত্র জগতের বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের নানান স্বীকৃতি –সম্মান প্রদান করছে। আপনিও চার দশক ধরে চলচিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সেইসব মঞ্চে তো আপনাকে পাওয়া যায় না। তবে কি গায়ে বামপন্থী তকমার জন্য ব্রাত্য ?
বিপ্লবঃ আমি কি বলব? সরকারের টাকা আছে বা কোথা থেকে জোগাড় করে স্বীকৃতি –সম্মান দিচ্ছে আমি দেখার কেউ নই। যারা সম্মান পাচ্ছেন তারা দেখছেন। পশ্চিমবঙ্গের জনগণ দেখছেন। সুতরাং আমার বলার কিছু নেই।
প্রশ্নঃ আপনি তো দেব জিতের সাথে কাজ করেছেন। বর্তমান বাংলা সিনেমার হিরো দেব জিত কিংবা সোহমের সিনেমা দেখেন। এদেরকে আপনার কেমন লাগে?
বিপ্লবঃ না তেমন দেখি না। দেখা হয়ে ওঠে না। নতুন বলতে জিতের সঙ্গে কাজ করেছি। জিত ভালো তবে এদের দোষ নেই বর্তমানে যে সব সিনেমা হচ্ছে বেশির ভাগই সাউথ ইণ্ডিয়ান সিনেমার রিমেক। তাছাড়া আর যা সিনেমা হচ্ছে তার কোন গল্প নেই। কি যে গল্প তা বোঝা বড় মুশকিল!
প্রশ্নঃ সম্প্রতি গুড্ডু কি গান নামে একটি হিন্দি সিনেমায় অভিনয় করলেন। পায়েল বা কুণাল খেমুর সাথে অভিনয় করে কেমন লাগল?
বিপ্লবঃ হ্যাঁ সিনেমাটি করেছি। ওদের সাথে অভিনয় করলাম । তবে অবাক লাগলো ছবিটি মুক্তি পেয়ে গেছে কিন্তু আমি জানি না। ভাবতে অবাক লাগে ছবিটি কবে মুক্তি পেয়েছে ওরা আমাকে সেটুকু জানানোর সৌজন্যটুকুও দেখায়নি।
সন্ধ্যের সেই আড্ডায় নানান প্রশ্নোত্তরে আমরা খুঁজে পাচ্ছিলাম এক ভিন্ন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়কে চলতে থাকবে এই অন্বেষণ আর বাংলা সিনেমা সম্পর্কে নানান চর্চা ।



