সৌরভের বার্তা গম্ভীর আদৌ বুঝবেন তো!‌

অজয় নন্দী

এ যেন সেই শিয়াল আর সারসের গল্প। একদিন শিয়াল তার বাড়িতে নেমন্তন্ন করল প্রতিবেশী সারসকে। একে তরল খাদ্য, তার ওপর খেতে দিল থালায়। শিয়াল খেয়ে নিলেও বেচারা সারসকে হতাশ হয়েই ফিরতে হল। এবার ঘটল ঠিক উল্টো ঘটনা। সারসের বাড়িতে আমন্ত্রিত শিয়াল। সারদ এবার খাবার দিল কলসীর মতো পাত্রে। সারসের ঠোঁট ঢুকে গেল ঠিকই, কিন্তু বেচারা শিয়াল। সে খেতেই পারল না।

বিশ্বক্রিকেটে এই সারস আর শিয়ালের কাণ্ড চলছে বহুদিন ধরে। ভারত যখন ঘরের মাটিতে খেলত, নিজেদের সুবিধামতো স্পিনের পিচ বানাতো। তারপর দু’‌জন বা তিনজন স্পিনারকে লেলিয়ে দেওয়া হত। বিপক্ষ নাস্তানাবুদ হত। এবার ভারত যখন বিদেশে যেত, তখন ঘটত উল্টোটা। অর্থাৎ, ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের স্বাগত জানাতে তৈরি হত সবুজ উইকেট। গতি আর বাউন্সের ঠেলায় পড়ে বিশ্রীভাবে হেরে ফিরতে হত ভারতকেও।

সেই ট্রাডিশন এখনও চলছে। অর্থাৎ, বিদেশি দল এলেই ঘূর্ণি উইকেট বানাও। তিনজন–‌চারজন স্পিনার খেলাও। তবে, একটা বড় তফাত হল, তখন ভারত একতরফা জিতত। এখন শোচনীয়ভাবে হারতে হয়। সেই স্পিনের উইকেট। তা সত্ত্বেও এমন লজ্জার হার কেন?‌ স্পিনার কি কম পড়িয়াছে?‌ আসলে, স্পিন খেলার লোকের বড়ই অভাব। এটা ঘটনা, বেদি, প্রসন্ন, চন্দ্রশেখর বা বেঙ্কট রাঘবনদের যুগ আর নেই। এমনকী, কুম্বলে, হরভজন, অশ্বিনরাও চলে গিয়েছেন ‘‌প্রাক্তন’‌ এর তালিকায়। ওয়াশিংটন সুন্দর, অক্ষর প্যাটেল, কুলদীপ যাদবরা নিশ্চিতভাবেই কুম্বলে–‌হরভজনদের থেকে হাজার মাইল পিছিয়ে। কিন্তু তারপরেও ভারতের বিপর্যয়ে মূল দায়ী করতে হবে ব্যাটিং বিভাগকেই।

গত বছর ঘরের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন টেস্টের সিরিজে তিনটিতেই হেরেছে ভারত। স্পিনাররা দায়িত্ব পালনে মোটামুটি সফল। বিপক্ষকে অল্প রানে বেঁধেও রেখেছিলেন। কিন্তু ভারতীয় ব্যাটিংয়ের ভরাডুবিই হারের মূল কারণ। সদ্য সমাপ্ত ইডেন টেস্টেও তাই। শেষ ইনিংসে মাত্র ১২৪ রান করতে হবে। সেই রানও তোলা গেল না। আসলে, টেস্টে ব্যাটিংয়ের মূল কথাই হল ধৈর্য। আইপিএলের আবহে সেই ধৈর্যটাই যেন হারিয়ে গেছে। টানা তিন–‌চারটি বল ঠেকালেই ছয় বা চার মারার জন্য হাত নিশপিস করছে। এত অল্প রানের টার্গেট, হাতে তিন দিন সময়, তবু এত তাড়াহুড়ো কীসের?‌ একের পর এক ব্যাটসম্যান যেন উইকেট উপহার দিয়ে গেলেন।

শুরু থেকেই পিচ প্রস্তুতকারকের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। শুরুর দিন থেকেই যেন বল ঘোরে। এ যেন মামাবাড়ির আবদার। ইডেনের পিচে বরাবরই একটা গুণমান বজায় থাকে। বহু বছর ধরেই ইডেনের উইকেট সারা বিশ্বে সমাদৃত। কিন্তু গৌতম গম্ভীর অ্যান্ড কোং কলকাতায় পা রাখার পর থেকেই ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে গেল। সিএবি সভাপতির নাম সৌরভ গাঙ্গুলি। তিনি জানেন, স্পোর্টিং পিচ কীভাবে বানাতে হয়। তিনি ভালমানের উইকেটই উপহার দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু টিম ম্যানেজমেন্ট যেন পিছনের দরজা দিয়ে জয় পেতে চেয়েছিল। শুধু ভারতীয় ব্যাটিং নয়, ইডেনের উইকেট সম্পর্কেও সারা বিশ্বের কাছে নেতিবাচক বার্তা গেল। গম্ভীরদের গোঁয়ার্তুমির জন্য ইডেনও কলঙ্কিত হল। অথচ, এর জন্য সিএবি বা পিচ প্রস্তুতকারক একেবারেই দায়ী নন। ম্যাচ শেষে সৌরভ বাধ্য হয়েই গম্ভীরকে পরামর্শ দিয়েছেন, ‘‌খারাপ পিচে আড়াই দিনে জেতার কোনও দরকার নেই। ভাল পিচে, পাঁচদিনে টেস্ট জেতো।’‌ যথার্থ অভিভাবকের মতোই পরামর্শ দিয়েছেন সৌরভ। কিন্তু গৌতম গম্ভীররা আদৌ এর মর্ম বুঝবেন তো!

Previous post সুরের ‘‌সলিলে’‌ প্রতিদিনই অবগাহন করি
Next post শূন্য পাওয়া পিকেই কিন্তু ম্যান অফ দ্য ম্যাচ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *