চ্যাম্পিয়ন হয়েই কি ফোকাস নড়ে গেল!‌

অজয় নন্দী

একটা সময় ছিল, যখন ভারতীয় ফুটবল দলের প্রথম একাদশে ৭ থেকে ৮ জন ফুটবলার ছিলেন বাঙালি। ৭ এর দশক, আটের দশকেও এমন ছবিটা হামেশাই দেখা যেত। কিন্তু এখন ভারতীয় দলে বাংলার ফুটবলার প্রায় দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয়। শুধু ভারত কেন, কলকাতার দুই প্রধান মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গলেও বাঙালি ফুটবলারের সন্ধান পাওয়া দুষ্কর। বড়জোর একজন বা দুজন।


বাঙালি ফুটবলারদের সেভাবে উঠে আসতে দেখা যাচ্ছে না কেন? এর নানা ব্যাখ্যা হতে পারে। কেউ বলতে পারেন, নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি, একটি বা দুটি সন্তান, ফলে অভিভাবকরা ছেলেদের খেলতে পাঠাচ্ছেন না। কেউ বলতে পারেন, পাড়ার মাঠগুলো প্রোমোটাররা দখল করে নিয়েছে, ফলে খেলার মাঠ নেই। কেউ কেউ বলতে পারেন, নতুন প্রজন্ম মাঠে খেলার বদলে স্মার্টফোন হাতেই সময় কাটাতে বেশি ভালোবাসে। কোন যুক্তিই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।


একটা সময় সন্তোষ ট্রফিতে বাংলার চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ও নিত্য নৈমিত্তিক এক ঘটনা। কারা কতবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, এই তালিকা করতে বসলে বাংলার ধারে কাছেও অন্য কোনও দলকে পাওয়া যাবে না। কিন্তু গত কয়েক দশকে এই ছবিটা অনেকটাই বিবর্ণ। দীর্ঘদিন পর গত বছর বাংলার মুকুটে উঠেছিল সন্তোষ ট্রফি। রবি হাঁসদা, নরহরি শ্রেষ্ঠা, চাকু মান্ডিদের নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল বাংলা। ভূমিপুত্রদের নিয়ে খেলেও সকলকে টেক্কা দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া যায়, এটা দেখিয়ে দিয়েছিলেন কোচ সঞ্জয় সেন। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও ফুটবলারদের চাকরির বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। তাদের ফুটবল জীবন যেন কোনও অনিশ্চয়তায় না পড়ে, সেই কথা মাথায় রেখে মানবিকভাবেই পাশে দাঁড়িয়ে ছিল রাজ্য সরকার।


কিন্তু এই বছর আবার সেই ব্যর্থতার সরণিতে হারিয়ে গেল বাংলা। ফাইনাল বা সেমিফাইনাল তো দূরের কথা, গ্রুপ লিগ থেকেই ছিটকে গেল গতবারের চ্যাম্পিয়নরা। কেন এই হার, তা নিয়ে নানা ময়নাতদন্ত হতেই পারে। আয়োজকদের অব্যবস্থা নিয়েও নানা প্রশ্ন থাকতেই পারে। ফুটবল মহলের অনেকেই মনে করছেন, সন্তোষ ট্রফির মত টুর্নামেন্টে নামার জন্য আরও দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতি দরকার। অনেক সময় ক্লাবগুলি তাদের ফুটবলারদের ছাড়তে চায় না। বা ছাড়লেও অনেক দেরিতে ছাড়ে। ফলে একসঙ্গে অনুশীলনের সুযোগ যেমন হয় না, তেমনি বিভিন্ন পজিশনের ফুটবলারদের মধ্যে বোঝাপড়াও গড়ে ওঠে না। গতবারের চ্যাম্পিয়ন দলের অধিকাংশ ফুটবলারকেই এবারের সন্তোষ ট্রফির দলে দেখা গেল না। অনেক ফুটবলার নাকি খেলার ব্যাপারে কোনও আগ্রহই দেখাননি। তবে কি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় ফুটবলের ওপর থেকে আকর্ষণ কমে গেল? ফুটবল থেকে তাঁদের ফোকাসটা কি হারিয়ে গেল?


গতবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর একদিকে যেমন সরকারি স্তরে স্বীকৃতি জুটেছিল, তেমনি আই এফ এ সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংবর্ধনা দিয়েছিল। এই স্বীকৃতি ও হৃদয় উজাড় করা ভালবাসার মর্যাদা তাঁরা হয়তো রাখতে পারলেন না। তবে এটাই একমাত্র কারণ নয়। বাংলা শুধু গতবারের চ্যাম্পিয়নদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবেই বা কেন? বিভিন্ন জেলা থেকে আরও অনেক প্রতিভা বাছাই করে তুলে আনা যেত। সেই উদ্যোগেও কোথাও একটা ঘাটতি থেকে গিয়েছিল। অনেকেই বলেন, বাংলার ফুটবলে প্রতিভার কোনও অভাব নেই। কিন্তু তাদের ঠিকঠাক তুলে আনা ও পরিচর্যায় অনেক ত্রুটি রয়ে গেছে।


সন্তোষ ট্রফির এই ব্যর্থতা অনেক কিছু চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। এখন দোষারোপের সময় নয়। হাহুতাশ করে বসে থাকারও সময় নয়। এখন দরকার আত্ম সমীক্ষার। এই আত্মসমীক্ষাই পারে আবার চ্যাম্পিয়নের মুকুট ফিরিয়ে আনতে।

Previous post বইমেলার ডায়েরি
Next post গণতন্ত্রই পারে অরাজকতার মেঘ সরিয়ে সম্প্রীতি ফেরাতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *