সুগত রায়মজুমদার
এবার রাজ্যের লোকসভা নির্বাচনের সমীক্ষায় জটিল সমীকরণ হতে চলেছে। অতীতে এ রাজ্যে মূলত দুপক্ষের মধ্যেই লড়াই চলত। কিন্তু এবারের লোকসভা নির্বাচন রাজ্যে দুটি সর্বভারতীয় দল ও দুটি আঞ্চলিক দলের মধ্যে লড়াই। কথা ছিল, এ রাজ্যে সিপিএম–কংগ্রেস জোট তৃণমূল ও বিজেপি–র বিরুদ্ধে লড়াই করবে। কিন্তু সেই জোট এখন জটে পরিণত হয়েছে। প্রথমে দু’দলই ঠিক করে, নিজেদের জেতা আসনে দু’পক্ষই হস্তক্ষেপ করবে না। এতে সিপিএম কংগ্রেসের ৪টি জেতা আসন ছেড়ে দিয়ে অন্য আসনগুলি নিজেরা ও শরিক দলগুলি ভাগ করে নিয়ে সমঝোতা করে নেবে। সেইমতোই এগোচ্ছিল। সিপিএম ও শরিকরা ২৫টি আসনে নিজেদের প্রতিনিধিদের দাঁড় করিয়ে প্রার্থী ঘোযণা করে দেয়। এরপর সিপিএম বীরভূমে রেজাউল করিমকে দাঁড় করিয়ে বিতর্ক তৈরি করে। পুরুলিয়া ও বসিরহাট কংগ্রেস দাবি করেছিল। কিন্তু সেগুলি ফরওয়ার্ড ব্লক ও সিপিআইয়ের পুরনো আসন। এই দুই আসনে প্রার্থীঘোষণাকেও ভালভাবে নেননি কং নেতৃত্ব। এতেই শুরু হয় জট। ফলে জোট এখন ভেস্তে গেছে। সেই জোটের জট আদৌ খুলবে কিনা, তা দু’একদিনের মধ্যেই বোঝা যাবে। এখনও পর্যন্ত জোট হয়নি। আর জোট না হলে কার কী ক্ষতি, কার কী লাভ, তা পরিষ্কার হবে।

এ রাজ্যে সিপিএম ও কংগ্রেসের প্রধান শত্রু তৃণমূল। বিজেপি নয়। এই দুটি দল চাইবে, তারা যেন এ রাজ্য থেকে তৃণমূলকে উচ্ছেদ করতে পারে। এজন্য সবরকম ঝুঁকি নিতে রাজি এই দুই দল। মুখে সিপিএম ও কংগ্রস, তৃণমূল ও বিজেপি দু’দলকেই শত্রু মনে করে। কিন্তু তারা শত্রু হিসেবে অগ্রাধিকার দেয় তৃণমূলকেই। দুই দলই চায়, এ রাজ্য থেকে তৃণমূলের উচ্ছেদ। কারণ, অধুনা শাসকদল তৃণমূলই কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে সিপিএমকে উচ্ছেদ করেছে এ রাজ্যের শাসন থেকে। পরে সেই তৃণমূলই কংগ্রেসকে ভাঙতে ভাঙতে একেবারে দৈন্যদশায় এনে দিয়েছে। তৃণমূলই সিপিএম ও কংগ্রেসকে এ রাজ্যে দুর্বল করেছে। এজন্য দুই দলের ক্ষোভ তৃণমূলেরই ওপর। তাদের প্রধান শত্রু তৃণমূল। বিজেপি নয়। বিজেপি যদি এই জটের সুযোগ নিয়ে ভাল ফল করে তৃণমূলকে দুর্বল করতে পারে, তাতেও দুই দলের কোনও আপত্তি নেই। এতে সিপিএম ও কংগ্রেসের প্রতিশোধস্পৃহা তো মিটবে। এবার দেখা যাক, কোন দল কী সুবিধা পাচ্ছে।
জোট হচ্ছে না বলে সবচেয়ে লাভবান হবে বিজেপি। কারণ, সিপিএম ও কংগ্রেস খুব ভাল করেই জানে, যদি জোট হত, তা হলে কিছুটা বেগ দিতে পারত তৃণমূল ও বিজেপি–কে। কিন্তু জোট না হওয়ায় এই দু’দলের সামনে সুযোগ সদ্ব্যবহারের সম্ভাবনা। দু’দলই চাইবে তৃণমূলকে যতটা সম্ভব, দুর্বল করতে। এতে যদি বিজেপি লাভবান হয়, হবে। তাতে কিছু এসে যায় না। জোট না হওয়ায় বিজেপি কিছু আসনও পেয়ে যেতে পারে। ক্ষতি হবে তৃণমূলের। এছাড়া তৃণমূলের মধ্যেও এয়ার স্ট্রাইকের পর কিছু উগ্র জাতীয়তাবাদীর উত্থান হয়েছে। যাঁরা চান দেশ আগে, দল পরে। সুতরাং তৃণমূলেরও একটা অংশ বিজেপি–কে জাতীয়তাবাদী দল ভেবে অগ্রসর হতে পারে। লাভ হবে বিজেপি–র। এ ছাড়া তৃণমূল ছেড়ে কিছু নেতা বিজেপি–তে গিয়ে নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি–র পালে হাওয়া তুলতে পারেন। যদিও ২০১১–১৯ পর্যন্ত তৃণমূলের অনেক পজিটিভ দিক রয়েছে। তৃণমূল উন্নয়ন নিয়েই ছিল। সেটাই তাদের সম্বল। সেজন্যই তাদের জনপ্রিয়তা একচেটিয়া এ রাজ্যে। রাস্তাঘাটের উন্নতি, নিকাশী ব্যবস্থা, আলো, চাষের প্রভূত উন্নতি ছাড়াও কন্যাশ্রী, সবুজসাথী, স্বাস্থ্যসাথীর মতো জনকল্যাণমূলক কাজ করেছে তৃণমূল।
লোডশেডিং বলতে গেলে সারা রাজ্যে নেই। এ ছাড়াও সিপিএমের আমলের দলবাজিও নেই। সবকিছুতে দল জনগণের মধ্যে জড়িয়ে যায় না। জনগণ ইচ্ছেমতো চলাফেরা করতে পারে, মত প্রকাশও করতে পারে। যেটা সিপিএমের আমলে একেবারেই ছিল না। তৃণমূলের আমলে গণতন্ত্রও অনেকটা ফিরেছে। সিপিএম আমলে নির্বাচন আসলেই অতীতে চাঁদার জুলুম চলত সাধারণ জনগণের ওপর। যা তৃণমূল একেবারেই করে না। এ সব দিকগুলিই তৃণমূলকে অন্য দলগুলি থেকে অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে। যদিও জটের জন্য খুব বেশি ধাক্কা খাবে না তৃণমূল। শুধু কয়েকটি আসন বিজেপি-র হাতে যেতে পারে। আর সিপিএম ও কংগ্রেস জনসাধারণ থেকে অনেকটাই দূরত্বে চলে যাবে এই নির্বাচনে। তবে তৃণমূলের এই সামান্য ক্ষতিও হবে আগামীদিনের বিধানসভা নির্বাচনে আসন্ন পূর্বাভাস। সেজন্য তৃণমূলকে এখন থেকেই সতর্ক হতে হবে। তৃণমূলের শুধু এই কাজগুলি করলেই হবে না। লোকসভা নির্বাচন–পরবর্তী তৃণমূলকে রাজ্যের যুবক–যুবতীদের জন্য চাকরির সুবন্দোবস্ত করতে হবেই। রাজ্যে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। রাজ্যের যুবকরা ভিন রাজ্যে ছুটেছে ভাল চাকরির আশায়। তাদের রাজ্যে ফেরাতেই হবে। না হলে সামনের দিন ডেকে আনবে বিপদ।
(এটি ওপেন ফোরাম। মতামত লেখকের নিজস্ব। তার দায়ও একান্তই পত্রলেখকের। এই মতামতের সঙ্গে বেঙ্গল টাইমসের সম্পাদকীয় নীতির কোনও সম্পর্ক নেই। লোকসভা ভোটকে ঘিরে আপনারাও আপনাদের নিজস্ব মতামত–বিশ্লেষণ পাঠাতে পারেন। নিরপেক্ষ হতে হবে, এমন কোনও শর্ত নেই। তবে, পর্যাপ্ত যুক্তি যেন থাকে, শালীনতার মাত্রা যেন বজায় থাকে। )

