রক্তিম মিত্র
কেউ দল থেকে অন্য দলে চলে গেলেই কতগুলো চেনা প্রতিক্রিয়া চোখে পড়ে।
১) উনি জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
২) উনি দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
৩) উনি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কাছে বিক্রি হয়ে গেছেন।
৪) ব্যক্তিস্বার্থেই উনি দলবদল করেছেন।
৫) নৈতিকতা থাকলে পদত্যাগ করুন।
৬) আমরা দল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করলাম।
ব্যাস, এখানেই সেই পর্বের সমাপ্তি। সব দোষ তাঁর ঘাড়ে চাপিয়ে দাও। নিজেরা হাত ধুয়ে ফেলো। ছাতনার বাম বিধায়ক ধীরেন্দ্রনাথ লায়েক তৃণমূলে নাম লেখানোর পরেও সেই একই প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে এবং যাবে।
যে মানুষটা চলে গেছে, তড়িঘড়ি সভা ডাকা হবে তাকে বহিষ্কারের জন্য। বহিষ্কার করে আরও একপ্রস্থ বিবৃতি। কিন্তু এটাই হয়ে আসছে।
কতগুলো সহজ বিষয় নেতৃত্ব বুঝেও বোঝেন না। নৈতিকতাই যদি থাকবে, তাহলে কেউ এক দলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে অন্য দলে যায়? তাহলে তার কাছে নৈতিকতা দাবি করা কেন? না, এঁরা পদত্যাগ করেন না। দু একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সাম্প্রতিক রাজনৈতিক চালচিত্র সেরকমই।
সোশাল মিডিয়ায় এঁদের নামে নানা কটাক্ষ হবে। দলবদলু, আয়ারাম–গয়ারাম, কেনারাম, লোভী, এসব নানা বিশেষণ দেওয়া হবে। ফটোশপে নানারকম ছবি হবে, শেয়ার হবে। তাতেই আনন্দ। ব্যাস, তাহলে আর আত্মসমীক্ষা করতে হবে না। আয়ানার সামনেও দাঁড়াতে হবে না।

একটা দলবদল অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়ে যায়। কিন্তু সেই প্রশ্নগুলো নিয়ে দলে আদৌ আলোচনা হয়? আত্মসমীক্ষা হয়?
কতগুলো বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ধীরেনবাবুর তৃণমূলে চলে যাওয়াটা হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনা নয়। অনেক আগে থেকেই এর পটভূমি তৈরি ছিল। অন্তত দেড় বছর আগে, বড়জোড়ায় অভিষেক ব্যানার্জির সভাতেই এই দলবদল হওয়ার কথা। সেই সময় অভিষেক দুর্ঘটনার শিকার হন। সভা বাতিল করতে হয়। দলবদলও পিছিয়ে যায়। সবাই জানতেন, শুধু দলীয় নেতৃত্বই জানতেন না। তাই আজ যাঁরা আকাশ থেকে পড়ার ভান করছেন, তাঁরা মাটির থেকে অনেকটাই দূরে, কোনও খবরই রাখতেন না। তারও আগে একবার কথা হয়েছিল। দরাদরিতে সেভাবে পোষায়নি। তাছাড়া, যতই হোক, গ্রামের মানুষ। কিছুটা চক্ষুলজ্জায় হয়ত সিদ্ধান্তটা নিতে পারেননি।
হ্যাঁ, কোথাও কোথায় ভয় দেখিয়ে, চাপ তৈরি করে দলবদল করতে বাধ্য করা হয়। সেক্ষেত্রে অসহায় হয়ে অনেকেই শাসক শিবিরে গেছেন। কিন্তু ধীরেনবাবুর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি মোটেই তেমন ছিল না। ভয়ের কারণে বা চাপের কারণে তিনি যাননি। তাঁর এলাকায় বরাবরই গণতান্ত্রিক আবহ ছিল, তখনও ছিল, এখনও আছে। তিনি একেবারেই স্বেচ্ছায় গেছেন। কী কী শর্তে গেছেন, সেটা নাইবা লিখলাম। ছোট ছোট শরিক দলে কতগুলো বাস্তব সমস্যা থাকে। গ্রহণযোগ্যতা বা রাজনৈতিক আনুগত্যের থেকেও ভোটের সময় কে কত খরচ করতে পারবে, এটা অনেক সময় প্রাধান্য পেয়ে যায়। কোনও দল ঠিকাদারকে প্রার্থী করেছে, কোনও দল তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ নেতাকে প্রার্থী করেছে। আদৌ সে বামমনষ্ক কিনা, তা ভেবে দেখাও হয়নি। মনে করুন এগরার কথা। সেখানে ডিএসপি কাকে প্রার্থী করল? তৃণমূলে টিকিট না পাওয়া মামুদ হোসেনকে। কারণ, তিনি ভাল ‘খরচ’ করতে পারবেন। এই লোক যদি জিতত, তাকে ধরে রাখা যেত? যা হওয়ার তাই হয়েছে। আবার তিনি স্বমহিমায় তৃণমূলে ফিরেছেন। ধীরেন্দ্রনাথ লায়েকের ক্ষেত্রেও ভোটে তিনি কত খরচ করতে পারবেন, এই মাপকাঠিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। যা হওয়ার, তাই হয়েছে। যাঁদের পঞ্চায়েত মেম্বার হওয়ারও যোগ্যতা নেই, তাঁদের বিধানসভার টিকিট দিলে যা হওয়ার, তাই হয়েছে।
একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন তো, সেখানে আদৌ জোনাল কমিটির অস্তিত্ব ছিল? ২০১১ নির্বাচনে হারার পর থেকে জোনাল সম্মেলন হয়েছিল? ব্রাঞ্চ, লোকাল, জোনাল–কোনও স্তরে কোথাও কোনও আলোচনা হয়েছিল? যাঁরা ‘মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহী’ ছিলেন, তাঁদের সেই অতিরিক্ত উৎসাহের কারণ নিয়ে কোনও অনুসন্ধান হবে? কী কী কারণে তাঁকে প্রার্থী করা হয়েছিল, সেই অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে কোনও আত্মসমীক্ষা হবে? গত দু’বছরে তাঁর কাজকর্মের কোনও মূল্যায়ণ হয়েছে? তাঁকে সামনে রেখে কে কী করেছেন, কীভাবে উপদলীয় কার্যকলাপ বেড়েছে, তার কোনও মূল্যায়ণ হবে? আজ সব দায় তাঁর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া খুব সহজ। সব জেনেও দার্শনিক সেজে থাকা খুব সহজ। এটা হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনা নয়। এটা অনিবার্যই ছিল। এই ন্যূনতম দূরদৃষ্টি অনেকের ছিল না। একা আরএসপি নেতৃত্বকে দোষারোপ করেও লাভ নেই। বড় শরিক সিপিএম–ও এই নামটাই চাপিয়ে দিয়েছিল। তাই এই পরিণতির নৈতিক দায় তাঁদেরও নিতে হবে। কিন্তু প্রশ্নটা হল, এই দায় নিতে কি কেউ রাজি আছেন? নাকি যে চলে গেছে, তাকে দোষারোপ করার দিকেই হাঁটবেন? দোষারোপ না আত্মসমালোচনা, কোনটা করবেন, বেছে নিন। প্রথমটা খুব সহজ, দ্বিতীয়টা একটু কঠিন।

